প্রতিবেদন: মুক্তিশিখা ডেস্ক
ঢাকা মহানগরী—উন্নয়ন, ব্যস্ততা আর কংক্রিটের শহর। কিন্তু রাজধানীর খুব কাছেই, বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর বুক চিরে গড়ে ওঠা এক ভিন্ন জগতের নাম কাউন্দিয়া ইউনিয়ন। প্রশাসনিকভাবে এটি মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্তর্গত হলেও বাস্তবে যেন এক দ্বীপ-জনপদ—সেতুহীন, অবহেলিত এবং রহস্যময়।
নদীর স্রোতই এখানে মানুষের জীবন নির্ধারণ করে। সকাল-সন্ধ্যা নৌকাই একমাত্র ভরসা। ঢাকার এত কাছে থেকেও কাউন্দিয়ার মানুষ যেন রাষ্ট্রের মূল স্রোতের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক জনগোষ্ঠী।
—
ভৌগোলিক অবস্থান ও দ্বীপ পরিচিতি
কাউন্দিয়া ইউনিয়ন মূলত একটি চরাঞ্চলভিত্তিক দ্বীপ। চারপাশে নদী, বর্ষায় জলরাশি আর শীতকালে কাদা ও বালুর রাজত্ব। কোনো স্থায়ী সেতু নেই—নৌকাই এখানকার একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। বর্ষাকালে নদী উত্তাল হলে পুরো ইউনিয়ন কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের ভাষায়,
> “নদী আমাদের মা, আবার নদীই আমাদের শত্রু।”
—
যোগাযোগ ব্যবস্থার ভয়াবহ সংকট
ঢাকা বা মুন্সীগঞ্জ শহরে যেতে হলে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নৌকা পার হতে হয়। স্কুলগামী শিশু, অসুস্থ রোগী, অন্তঃসত্ত্বা নারী—সবার জন্যই নদী পার হওয়া এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা।
অনেক সময় জরুরি রোগী সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে প্রাণ হারান। শুষ্ক মৌসুমে চর জেগে উঠলে নৌকা চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে, আবার বর্ষায় স্রোত ও ঝড় ভয়াবহ রূপ নেয়।
—
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: অধরাই থেকে যায় স্বপ্ন
কাউন্দিয়ায় কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে একটিমাত্র হাইস্কুল। বাকি শিক্ষার্থীদের নদী পার হয়ে যেতে হয় শহরে। ফলে অনেক শিশু-কিশোর অল্প বয়সেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।
স্বাস্থ্যসেবার চিত্র আরও করুণ। ইউনিয়নে কোনো পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। একজন পল্লী চিকিৎসক বা ওঝাই অনেক সময় ভরসা। জটিল রোগে আক্রান্ত হলে নদী পার হয়ে হাসপাতালে নেওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
—
জীবিকা: নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করেই বেঁচে থাকা
এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা—
মাছ ধরা
কৃষিকাজ
দিনমজুরি
নৌকা চালানো
কিন্তু নদীভাঙন, বন্যা ও চর বিলীন হওয়ার কারণে স্থায়ী জীবিকা গড়ে ওঠে না। অনেক পরিবার বারবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। জমি থাকলেও তা নদীগর্ভে চলে যায়—কাগজে মালিক, বাস্তবে ভূমিহীন।
—
সেতু: উন্নয়ন না ধ্বংস—দ্বিধায় দ্বীপবাসী
কাউন্দিয়ার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় সেতু। একদিকে মানুষ চায় যোগাযোগ, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাজার সুবিধা। অন্যদিকে অনেকের আশঙ্কা—সেতু হলে বাইরের দখলদার, ভূমিদস্যু ও শিল্পপতিরা এই দ্বীপ গ্রাস করবে।
স্থানীয় এক বৃদ্ধ বলেন,
> “সেতু হলে আমাদের ছেলে-মেয়েরা বাঁচবে, কিন্তু আমাদের জমি থাকবে তো?”
এই দ্বন্দ্বই কাউন্দিয়াকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে—উন্নয়ন বনাম অস্তিত্ব।
—
রাষ্ট্রীয় নজরের বাইরে এক জনপদ
বারবার প্রতিশ্রুতি এলেও বাস্তব উন্নয়ন পৌঁছায়নি। নির্বাচনের সময় নেতা আসেন, নদী পার হন, ছবি তোলেন—তারপর আবার নীরবতা।
কাউন্দিয়া যেন ঢাকার খুব কাছেই থাকা এক “অদৃশ্য ইউনিয়ন”।
—
মুক্তিশিখার দৃষ্টিতে কাউন্দিয়া
কাউন্দিয়া ইউনিয়ন কেবল একটি দ্বীপ নয়—এটি রাষ্ট্রীয় অবহেলা, উন্নয়ন বৈষম্য ও মানুষের টিকে থাকার সংগ্রামের জীবন্ত দলিল। এখানে মানুষের জীবনযাপন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—উন্নয়নের গল্পের আড়ালে কত অদৃশ্য মানুষ রয়ে গেছে।
মুক্তিশিখা বিশ্বাস করে, কাউন্দিয়ার গল্প কেবল সহানুভূতির নয়—এটি ন্যায্য অধিকার ও মানবিক উন্নয়নের প্রশ্ন।
—
✒️ মুক্তিশিখা
আলো জ্বালুক অবহেলিত মানুষের গল্পে





