প্রতিবেদন : বিশেষ প্রতিনিধি
রাজধানীর ভোর মানেই শুধু জেগে ওঠা শহর নয়, ভোর মানেই একদল মানুষের নিঃশব্দ উপস্থিতি। সূর্য ওঠার আগেই তারা এসে জড়ো হয় রাজধানীর এক কোণে— পরিচিত এই জায়গাটি মানুষের কেনাবেচার হাট নামে। এখানেই প্রতিদিনের মতো বসে থাকেন ৬৫ বছর বয়সী মুজিবুর রহমান।
মুজিবুর রহমানের বাড়ি সিরাজগঞ্জে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়েও তিনি এখনো শ্রম বিক্রি করেন। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও কাজই তার একমাত্র ভরসা।
নিঃসঙ্গ জীবনের গল্প
মুজিবুর রহমান নিঃসন্তান। একসময় বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু সেই সংসার টেকেনি। তার স্ত্রী অন্য একজনের সঙ্গে চলে যান। এরপর আর নতুন করে সংসার গড়ার সাহস বা সামর্থ্য— কোনোটাই হয়নি।
তিনি বলেন,
“একাই আছি ভাই। কেউ নাই। কাজ থাকলে খাই, না থাকলে না খেয়েও থাকি।”
এই একাকিত্ব তার কণ্ঠে তীব্র হাহাকার হয়ে ওঠে না, বরং নীরব এক মেনে নেওয়ার গল্প শোনায়।
মাটি কাটাই তার জীবন
মানুষের এই হাটে সবাই সব ধরনের কাজ করে না। মুজিবুর রহমান মূলত মাটি কাটার কাজ করেন। রাস্তা, ভবনের ভিত্তি, ড্রেন— যেখানে মাটি কাটার প্রয়োজন, সেখানেই ডাক পড়লে তিনি যান।
তবে বয়সের কারণে নিয়মিত কাজ পাওয়া কঠিন। সপ্তাহে গড়ে ৩ থেকে ৪ দিন কাজ জোটে তার। বাকি দিনগুলো কাটে অপেক্ষায়।
“বয়স হইছে, সবাই আর ডাকে না। তবুও যা পাই, আল্লাহর রহমত,”— বলেন তিনি।
কাজ না থাকলে অপেক্ষাই সম্বল
ভোরে হাটে এসে বসে থাকেন মুজিবুর রহমান। হাতে থাকে একটি গামছা, পাশে পানির বোতল। কারো ডাক পড়লে উঠে যান, না পড়লে দুপুর পর্যন্ত বসে থাকেন।
রোদে পুড়ে, কখনো বৃষ্টিতে ভিজে— এই অপেক্ষা তার নিত্যদিনের সঙ্গী। তবুও অভিযোগ নেই।
“আজ না হইলে কাল হইবেই— এই আশায় বসি,” বলেন তিনি।
শহর গড়ে যারা, তারা থেকেই যায় অচেনা
মুজিবুর রহমানের মতো শ্রমিকদের হাতেই গড়ে ওঠে শহরের রাস্তা, দালান, স্থাপনা। অথচ তাদের জীবনে নেই স্থায়ী কাজ, নেই সামাজিক নিরাপত্তা, নেই বার্ধক্যভাতা বা চিকিৎসার নিশ্চয়তা।
৬৫ বছর বয়সেও মাটি কাটতে বাধ্য হওয়া মুজিবুর রহমান যেন নগর জীবনের এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
তবুও জীবন থামে না
বিকেলের দিকে মানুষের হাট ফাঁকা হয়ে আসে। কাজ না পেলে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান মুজিবুর রহমান। আজ কাজ মিলুক বা না মিলুক— কাল আবার আসবেন।
কারণ তার কাছে এই হাটই শেষ আশ্রয়।
মুজিবুর রহমান বলেন,
“কাজ করলেই মন ভালো থাকে। বসে থাকলে চিন্তা বাড়ে।”
শেষ কথা
মুজিবুর রহমান কোনো ব্যতিক্রম নন। রাজধানীর মানুষের হাটে এমন শত শত প্রবীণ শ্রমিক প্রতিদিন অপেক্ষা করেন— কাজের জন্য, বেঁচে থাকার জন্য, একটু সম্মানের জন্য।
এই হাট শুধু শ্রমের বাজার নয়—
এটা নিঃসঙ্গ মানুষের জীবনের শেষ লড়াই।






